বিশেষ প্রতিনিধি ::
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য রয়েছে একটি স্বস্তির খবর। আকস্মিক বন্যা ও প্রজনন পর্যায়ের ঠান্ডাজনিত ক্ষতির ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ঠান্ডাসহনশীল নতুন জাতের বোরো ধান উদ্ভাবন করেছে। নতুন এই জাতটির নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ব্রি ধান-১১৮। গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় গাজীপুরের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত এই জাতকে চাষাবাদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। এ সময় ব্রির মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ব্রি ধান-১১৮ ছাড়াও ব্রি ধান-১১৫, ব্রি ধান-১১৬, ব্রি ধান-১১৭, ব্রি হাইব্রিড ধান-৯ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ ধান অবমুক্ত করা হয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই নতুন ছয়টি জাত যুক্ত হওয়ার ফলে এখন পর্যন্ত ব্রি উদ্ভাবিত ধানের মোট জাতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৭-এ। ব্রি ধান-১১৮ : বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান-২৮-এর সঙ্গে ভুটানের একটি ঠান্ডা-সহনশীল ধানের সংকরায়ণে এই জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা এবং ধাপে ধাপে ভালো গাছ বাছাইয়ের মাধ্যমে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে দ্রুত কয়েক প্রজন্ম এগিয়ে এনে এই নতুন ধানের জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। হাওরাঞ্চলের উপযোগিতা যাচাইয়ে গাজীপুরে ব্রির গবেষণা খামার, হবিগঞ্জের আঞ্চলিক কার্যালয়, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের মাঠে পর পর দুই বছর ফলন পরীক্ষা চালানো হয়। ২০২২-২৩ বোরো মৌসুমে ১০টি স্থানে আঞ্চলিক উপযোগিতা পরীক্ষা এবং ২০২৪-২৫ রবি মৌসুমে ১০টি স্থানে ‘চাষ ও ব্যবহারযোগ্যতা পরীক্ষা’ ট্রায়াল সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ১০টি স্থানের মধ্যে চারটি স্থানে চেক জাতের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি ফলন পাওয়া গেছে। সামগ্রিকভাবে এই জাতটির হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৬.৭৭ টন, যেখানে চেক জাতের গড় ফলন ৬.৪১ টন। জাতটির গড় জীবনকাল ১৩৬-১৩৭ দিন, যা হাওর এলাকার জন্য তুলনামূলকভাবে স্বল্প। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে পর পর দুই বছর স্বাতন্ত্র্যতা, একরূপতা ও স্থায়িত্ব পরীক্ষায় জাতটির চেক জাত ব্রি ধান-২৮-এর তুলনায় পাঁচটি বৈশিষ্ট্যে স্বাতন্ত্র্যতা দেখা গেছে। রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও বেশির ভাগ স্থানে সহনীয় পর্যায়ে ছিল। জাতটির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে কৃষিবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ব্রি ধান-১১৮ একটি আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাত। গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার, পাতা আধা-খাড়া ও প্রশস্ত এবং ধান পাকলেও ডিগপাতা সবুজ থাকে। চালের রং সাদা, আকার মাঝারি মোটা এবং ভাত ঝরঝরে। চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৮.৩ শতাংশ এবং প্রোটিন ৯.১ শতাংশ। ধান গবেষকরা জানিয়েছেন, হাওর এলাকায় আগাম বপন করলে সাধারণত প্রজনন পর্যায়ে ঠা-াজনিত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তবে এই জাতটি ঠান্ডা-সহনশীল হওয়ায় ২৫ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বরের মধ্যে বপন করলেও গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকা সত্ত্বেও হেক্টরপ্রতি প্রায় ছয় টন ফলন পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক সময়ে বপনে ফলন ৬.৯ টন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় ৮.৫ টন পর্যন্ত ফলনের সম্ভাবনাও রয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় মোট ৩৭৩টি হাওর রয়েছে। যার আয়তন প্রায় ৮০ থেকে ৮৬ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ লাখ হেক্টর জমি চাষের উপযোগী। এই চাষযোগ্য জমির প্রায় ৮০ শতাংশে বোরো ধান এবং ১০ শতাংশে আমন ধানের চাষ হয়। এসব হাওর এলাকা থেকে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ আসে। হাওর এলাকায় স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ধানের জাত চাষ করতে গিয়ে কৃষকরা নানা সমস্যায় পড়েন। হাওরে ধান পাকতে শুরু করার সময় প্রায়শই আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। ফসল এই বন্যা থেকে রক্ষা করতে আগাম চাষ করলে প্রজনন পর্যায়ে ঠা-াজনিত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত বেশির ভাগ জাতের ধানের জীবনকাল ১৪০ থেকে ১৬০ দিন। এসব ধান সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বপন করা হয়। ফলে ফসল কাটার সময় আকস্মিক বন্যার কারণে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার যদি আগাম বপন করা হয়, তাহলে প্রজনন পর্যায়ে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ঠান্ডাজনিত কারণে ধান চিটা হয়ে যায়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে হাওরাঞ্চলের জন্য ঠান্ডা-সহনশীল ও স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। অপরদিকে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বোরো মৌসুমে বেশি ফলনের নতুন বিকল্প ব্রি ধান-১১৬। বোরো মৌসুমের একটি নাবি ও উচ্চ ফলনশীল জাত। এটি জনপ্রিয় ব্রি ধান-৯২-এর সমসাময়িক দীর্ঘ জীবনকালের জাত। গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন। পাতা খাড়া ও লম্বা হওয়ায় শিষ ওপরে দেখা যায় না এবং ধান পাকলেও পাতা সবুজ থাকে। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৫৯ টন, উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় যা ১০ দশমিক ৩৬ টন পর্যন্ত হতে পারে। বিএডিসির জেনারেল ম্যানেজার (বীজ) আবীর হোসেন জানান, হাওর এলাকার উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন কৃষি উৎপাদন নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষকের মাঠে নতুন এই জাতের ধান চাষের পথ খুলে যাবে। ব্রি উদ্ভিত প্রজনন বিভাগ ও গবেষণা টিমের প্রধান খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা জানান, প্রায় ৮ বছর কয়েকটি টিম একসঙ্গে কাজ করে নতুন ৬টি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। নতুন ধানের জাতগুলো চাষাবাদ করলে কৃষকেরা লাভবান হবেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
হাওরের উপযোগী নতুন জাতের ধান চাষের জন্য অবমুক্ত
- আপলোড সময় : ০৭-০২-২০২৬ ০৫:৩৭:৪০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৭-০২-২০২৬ ০৫:৩৮:১০ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি